অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের মূল বক্তব্য কী ছিল? ওই বক্তব্যের সঙ্গে বয়কট ও স্বদেশি আন্দোলনের কোনো যোগ খুঁজে পাওয়া যায় কি? ।
অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের মূল বক্তব্য ছিল, ভারত ধীরে ধীরে ব্রিটেনের কৃষিজ কাঁচামাল আহরণের ভূমিতে পরিণত হয়েছে। আর ব্রিটেনে তৈরি দ্রব্যগুলির বৃহৎ বাজার হিসেবে ভারতকে ব্যবহার করতে থাকে ঔপনিবেশিক সরকার। এসবের ফলে ভারতের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে কেবল ব্রিটেনের অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষার জন্য ব্যবহার করা হতে থাকে। ব্রিটিশ মূলধন বিনিয়োগের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে ভারত। আর সেই উদ্যোগের যাবতীয় লাভ চলে যায় ব্রিটেনে। ফলে ভারতীয় কৃষি ও শিল্প ধ্বংস হয়। যাবতীয় সম্পদ চলে যায় বিদেশে। এ ছাড়া, উঁচু হারে কৃষকেরা ভূমি-রাজস্ব দিতে বাধ্য হয়। ফলে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় ভারতীয় পণ্য মার খায়। ব্রিটিশ পণ্য আমদানিতে শুল্ক বা মাসুল বসানো হত না। তার ফলে ভারতের শিল্পায়ন ব্যাহত হতে থাকে। শিল্পের বদলে কৃষিতে চাপ বাড়ে। অধিকাংশ লোক কৃষিনির্ভর হয়ে পড়ার ফলে ও কৃষির উপযুক্ত কাঠামো না থাকায় দেশের দারিদ্র্য আরও বেড়ে গিয়েছিল।
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জন বাংলা বিভাজন করেন। এর বিরুদ্ধে সমগ্র বাংলা বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন থেকে ক্রমেই জেগে ওঠে স্বদেশি আন্দোলন। স্বদেশি আন্দোলনে ডাক দেওয়া হলো—বয়কট করো, বিদেশি দ্রব্য বর্জন করো, স্বদেশি জিনিস ব্যবহার করো। কিন্তু এই স্বদেশি আন্দোলনে স্বদেশি জিনিস ব্যবহার করতে গিয়ে সাধারণ গরিব মানুষের ওপর অসম্ভব চাপ পড়ে গিয়েছিল। কারণ স্বদেশি জিনিসের দাম ছিল বেশি আর বিদেশি দ্রব্যের দাম ছিল কম। অথচ বয়কট আন্দোলনে বিদেশি দ্রব্য রাশি রাশি পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের সঙ্গে বয়কট ও স্বদেশি আন্দোলনের যোগ: হ্যাঁ, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের বক্তব্যের সঙ্গে বয়কট ও স্বদেশি আন্দোলনের গভীর যোগ আমি খুঁজে পাই। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদীরাও এই প্রসঙ্গই বলেছিলেন যে, এদেশের শিল্পায়ন ব্যাহত হওয়ায় কৃষির ওপর অধিকাংশ মানুষ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল, অথচ কৃষির উপযুক্ত কাঠামো না থাকায় দেশের দারিদ্র্য আরও বেড়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশদের এই অর্থনৈতিক শোষণ ও লুণ্ঠনের তত্ত্ব বা 'সম্পদ নির্গমন' (Drain of Wealth)-এর মাধ্যমেই দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, ব্রিটিশ শাসনই ভারতের দারিদ্র্যের মূল কারণ। আর এই উপলব্ধির ফলেই ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে যে স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার মূল চালিকাশক্তি হয়েছিল এই অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ। দেশীয় শিল্পকে বাঁচানো এবং ব্রিটিশ অর্থনৈতিক আধিপত্যকে খর্ব করাই ছিল ওই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য।
