কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের সঙ্গে কৃষক-অসন্তোষ ও বিদ্রোহের কী সরাসরি সম্পর্ক ছিল? সেই নিরিখে 'দাক্ষিণাত্যের হাঙ্গামা'কে তুমি কীভাবে বিচার করবে?
কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ থেকে ভারতীয় কৃষক সম্প্রদায় বিশেষ লাভবান হতে পারেনি। কৃষির উন্নতির বেশির ভাগ সুযোগ-সুবিধাটুকু আর্থিকভাবে শক্তিশালী কৃষিজীবীরা কাজে লাগাতে পেরেছিল। ঔপনিবেশিক শাসনাধীন ভারতীয় অর্থনীতিতে বাণিজ্যের উন্নতির জন্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক ফসল, যেমন—চা, নীল, পাট, তুলো প্রভৃতি ফসল চাষের ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু কৃষির এই বাণিজ্যিকীকরণের ফলে ভারতীয় কৃষক সমাজে পারস্পরিক ভেদাভেদ তৈরি হয়েছিল। কৃষির আধুনিকীকরণের সঙ্গে মূলধন জোগাড় করা ও বাজারের চাহিদা মতো কৃষিজ ফসল উৎপাদনের বিষয়গুলি জড়িত ছিল। ওইসব বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া সাধারণ কৃষকদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে কৃষিতে যা লাভ হতো তা থেকে মূলধন বিনিয়োগকারীরাই সব লুটেপুটে খেয়ে ফেলত। যেমন পূর্ব ভারতে নীলকররা অর্থ বিনিয়োগ করে কৃষকদের জোর করে নীল চাষে নিয়োজিত করত। নীলচাষ থেকে যা-কিছু লাভ তার সম্পূর্ণই খেয়ে ফেলত নীলকররা। এমনকি নীলচাষিরা চাষের জন্য অগ্রিম টাকা নিয়ে যথাসময়ে শোধ করতে না পারায় জমির মালিকানা থেকেই বঞ্চিত হয়ে যেত। ফলে লাভজনক নীলচাষকে ঘিরে বাংলার অঞ্চলেই কৃষকদের সঙ্গে নীলকর ও কোম্পানির সংঘর্ষের পথ তৈরি হয়েছিল।
কৃষির এই বাণিজ্যিকীকরণের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল। কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগে সবচেয়ে লাভবান হয়েছিল বিনিয়োগকারীরাই। যেমন দাক্ষিণাত্যে সাহুকর-মহাজনেরা চাষিদের তুলো চাষে সাহায্য করতে অগ্রিম টাকা ধার দিত। ওই অগ্রিম টাকার বিনিময়ে তারা উৎপন্ন ফসলের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করত। এর বিরুদ্ধে তুলো চাষিরা বিদ্রোহী হয়ে আহমদনগর ও পুনা জেলায় সাহুকরদের আক্রমণ করে তাদের দখলে রাখা কাগজগুলি পুড়িয়ে দেয়। ঔপনিবেশিক প্রশাসন ওই বিদ্রোহকে 'দাক্ষিণাত্য হাঙ্গামা' নাম দিয়েছিল।
