চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সঙ্গে রায়তওয়ারি ও মহলওয়ারি বন্দোবস্তগুলির তুলনামূলক আলোচনা করো। তিনটির মধ্যে কোনটি কৃষকদের জন্য কম ক্ষতিকারক বলে তোমার মনে হয়? যুক্তি দিয়ে লেখো।
সতেরোশো বাহাত্তর খ্রিস্টাব্দে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের গভর্নর-জেনারেল লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস রাজস্ব আদায়ের জন্য ইজারাদারি ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। কিন্তু তাতে বিশেষ সুবিধা না হওয়ায় ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিশ রাজস্ব সংক্রান্ত প্রশাসনকে নতুন করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। কোম্পানির তরফে ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২২ মার্চ বাংলায় রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করা হয়।
রায়ত শব্দের অর্থ কৃষক। রায়ত অর্থাৎ কৃষককে সরাসরি জমির মালিক স্বীকার করে নেওয়ার মাধ্যমে তাদের ওপর জমিদারের অত্যাচারকে এড়ানো যাবে বলে মনে করা হয়েছিল। তাই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতে কোম্পানি-শাসন প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর ওই অঞ্চলে বড়ো মাপের জমিদার বিশেষ না থাকায় সরাসরি কৃষকের হাত থেকেই রাজস্ব আদায়ের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তাকে বলা হয় রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত।
মহল কথাটির অর্থ কয়েকটি গ্রামের সমষ্টি। মহলওয়ারি বলতে আদতে গ্রামভিত্তিক বন্দোবস্তকে বোঝানো হতো। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিস্তৃত এলাকার ভূমি-রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে মহলওয়ারি বন্দোবস্ত চালু করা হয়েছিল।
উপযুক্ত তিনটি বন্দোবস্তেই ভারতের কৃষক সম্প্রদায় চরম দুর্দশার শিকার হয়েছিল। বাংলার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদারদের বিপুল সমৃদ্ধি বেড়েছিল আর কৃষকরা জমিদারের অনুগ্রহনির্ভর প্রজায় পরিণত হয়েছিল। মাদ্রাজ অঞ্চলের রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের ফলে কৃষকরা আসলে ঔপনিবেশিক শাসকের ভাড়াটে চাষি হিসেবে জমিতে চাষের অধিকার পেয়েছিল। কোথাও কোথাও মোট উৎপাদনের ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ খাজনা কৃষকের কাছ থেকে ঔপনিবেশিকরা প্রায় বলপূর্বক কেড়ে নিত। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতেও মহলওয়ারি বন্দোবস্তে নির্দিষ্ট সময় অন্তর রাজস্ব সংশোধন করে প্রায়ই উঁচু হারে ধার্য করা হতো। অতএব রাজস্বের বাড়তি বোঝা, তা মেটাতে ধার করা এবং ধার শোধ দিতে না পারার অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হতো কৃষকদের।
তুলনামূলক বিচারে কৃষকদের পক্ষে তুলনামূলক কম ক্ষতিকারক বন্দোবস্ত: এই তিনটি ব্যবস্থার মধ্যে কোনোটিকেই পুরোপুরি জনহিতকর বলা চলে না, কারণ প্রতিটি ব্যবস্থাই কৃষকদের শোষণের হাতিয়ার ছিল। তবে তুলনামূলকভাবে বিচার করলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কিছু মাত্রায় কম ক্ষতিকারক ছিল বলা যায়। কারণ এই ব্যবস্থায় সরকারের প্রাপ্য রাজস্বের পরিমাণ স্থায়ী করে দেওয়া হয়েছিল বলে মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত খাজনা বৃদ্ধির অনিয়শ্চতা থেকে কৃষকরা কিছুটা রেহাই পেত (যদিও জমিদারদের অত্যাচারের হাত থেকে তারা রক্ষা পায়নি)। পক্ষান্তরে, রায়তওয়ারি ও মহলওয়ারি ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময় অন্তর সরকারের খামখেয়ালে বা জরিপের নামে রাজস্বের হার বারবার বাড়িয়ে দেওয়া হতো, যা কৃষকদের আরও বেশি গ্রাসাচ্ছাদনের অনুপযুক্ত করে তুলেছিল।
