অষ্টাদশ শতকে ভারতে প্রধান আঞ্চলিক শক্তিগুলির উত্থানের পিছনে মুঘল সম্রাটদের ব্যক্তিগত অযোগ্যতাই কেবল দায়ী ছিল? তোমার বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দাও।
মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গির ও সম্রাট শাজাহানের আমল থেকেই মুঘল শাসন কাঠামোয় ছোটোবড়ো কিছু কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তারপর ঔরঙ্গজেবের শাসনকালের শেষ দিক থেকেই মুঘল সাম্রাজ্যের কাঠামোগত এবং মুঘল উত্তরাধিকারীদের দুর্বলতার কারণে সাম্রাজ্যের ভিতরে আঞ্চলিক শক্তিগুলি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মুঘল দরবারের শক্তিমান অভিজাতবর্গ মুঘল সম্রাটদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ মুঘল শাসকের মধ্যে শাসনক্ষমতা ঠিক ঠিক না থাকায় বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তিগুলি এক-একটি অঞ্চলে সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছিল।
এই আঞ্চলিক শক্তিগুলির মধ্যে প্রধান তিনটি শক্তি হলো—বাংলা, হায়দরাবাদ ও অযোধ্যা। সুবা বাংলার রাজস্ব ঠিকমতো আদায়ের জন্য মুরশিদকুলি খানকে বাংলার দেওয়ান হিসেবে পাঠিয়েছিলেন সম্রাট ঔরঙ্গজেব। তিনি সম্রাট বাহাদুর শাহর আমলেও দেওয়ান ছিলেন। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট ফাররুখশিয়র তাঁকে পাকাপাকি দেওয়ান হিসেবে এবং বাংলার নিজাম হিসেবে মান্যতা দান করলে মুরশিদকুলি খানের নেতৃত্বে বাংলার উত্থান ঘটে। মুঘল দরবারের এক শক্তিশালী অভিজাত মির কামার উদ-দিন খান সিদ্দিকি মুঘল বাদশাহদের কাছ থেকে প্রশস্তি লাভ করে হায়দরাবাদে আসেন। সেখানকার মুঘল প্রাদেশিক শাসক মুবারিজ খানকে হারিয়ে ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। শেষমেশ ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে মির কামার উদ-দিনের নেতৃত্বে স্বাধীন হায়দরাবাদ রাজ্য সৃষ্টি হয়। অযোধ্যার স্থানীয় রাজা ও গোষ্ঠীর নেতাদের বিদ্রোহের মোকাবিলা করার জন্য সাদাৎ খানকে মুঘল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ অযোধ্যায় পাঠালে সাদাৎ খান সম্পূর্ণ সফল হন। এরপর ধীরে ধীরে ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে সাদাৎ খানের নেতৃত্বে স্বশাসিত আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে অযোধ্যা আত্মপ্রকাশ করে। উপরোক্ত ঘটনাগুলি অষ্টাদশ শতকের ভারতে আঞ্চলিক শক্তিগুলির উত্থানে মুঘল সম্রাটদের ব্যক্তিগত অযোগ্যতাই প্রমাণ করে।
