ফরাসি বিপ্লবের জন্য বুরাবোঁ রাজতন্ত্রের দায়িত্ব কতখানি?

ফরাসি বিপ্লবের জন্য বুরাবোঁ রাজতন্ত্রের দায়িত্ব কতখানি?

ফরাসি বিপ্লবের জন্য বুরাবোঁ রাজতন্ত্রের দায়িত্ব কতখানি?

ফরাসি বিপ্লবের জন্য বুরাবোঁ রাজতন্ত্রের দায়িত্ব কতখানি?

রাসি বিপ্লবের কারণ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক কারণ হিসেবে বুরবো রাজতন্ত্রের দায়িত্ব ছিল সর্বাধিক । পূর্বেই বলা হয়েছে, ফ্রান্সের সর্বাধিক শক্তিশালী চতুর্দশ লুইয়ের আমল (1643-1715) থেকে দেশে অর্থনৈতিক সংকট সূচিত হয় । তাঁর আমলেই যুদ্ধের জন্য এবং রাজসভার বিলাস ও জাঁকজমকতার জন্য অঢেল অর্থ ব্যয় করা হত । তবে শক্তিশালী নরপতি হিসেবে তিনি নিজের আমলে এসবের মোকাবিলা করতে সক্ষম হন; কিন্তু চতুর্দশ লুই ছিলেন চূড়ান্ত স্বৈরাচারী রাজা । তিনি নিজেকে রাজ্যের সর্বোচ্চ শাসক শুধু মনে করতেন এমন নয়, তিনি মনে করতেন, 'আমিই রাষ্ট্র'। বস্তুত ফ্রান্সের পুরোনো ব্যবস্থায় রাজতন্ত্রের দুর্বলতা ছিল প্রকট । অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত ও স্বৈরাচারী এই রাজতন্ত্র পঞ্চদশ লুইয়ের রাজত্বকালে (1715-1774) আরও বেশি সংকটের সম্মুখীন হয় । এরপর ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংঘর্ষ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল রাজা ষোড়শ লুইয়ের রাজত্বকালে (1774-1793) । ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক কারণ বলতে তৎকালীন শাসনতন্ত্র, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং সংকট দূরীকরণে রাজতন্ত্রের ব্যর্থতাই বোঝায় । বলা বাহুল্য, এর জন্য রাজতন্ত্রই দায়ী ছিল ।

প্রথমতঃ, বুরবোঁ (Bourbon) বংশীয় রাজারা ছিলেন নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রে বিশ্বাসী । কোনও জ্ঞানদীপ্তি তাদের উপর বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারে নি ।
দ্বিতীয়তঃ, স্বৈরতন্ত্রে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল রাজার হাতে, এমনকি 1614 থেকে পরবর্তী 175 বছর রাজারা ফরাসি পার্লামেন্ট বা জাতীয় সভা, যার নাম ছিল স্টেটস্ জেনারেল, তার অধিবেশন পর্যন্ত ডাকেন নি । তবে এই সংসদেও ছিল শ্রেণী-ভিত্তিক ভোট অর্থাৎ যাজক, অভিজাত এবং তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রত্যেকের একটি ক'রে ভোট। প্রতিনিধিদের প্রত্যেকের মাথা পিছু ভোট নয়।
তৃতীয়তঃ, রাজশক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে উচ্চতর যাজক ও অভিজাত শ্রেণী বিশেষ সুবিধা ভোগ করত।
চতুর্থতঃ, দরবারি বিলাসিতার প্রাচুর্য, প্রশাসনিক জটিলতা, অকারণ যুদ্ধ, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি রাজতন্ত্রকে দূর্বল করে দেয়।

সতেরো শতকেই সম্রাট চতুর্দশ লুই এবং মন্ত্রী তথা রাজনীতিজ্ঞ কার্ডিরনাল বিশলু, ম্যাজারিণ প্রমুখ ফরাসি রাজতন্ত্রকে শুধু স্বৈরাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেনি, রাজতন্ত্র ঈশ্বর-প্রদত্ত বা দেবদত্ত ক্ষমতার উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। 'আমিই রাষ্ট্র' বলার মধ্যে চতুর্দশ লুইয়ের সেই দম্ভ এই ক্ষেত্রে মনে পড়ে। আবার সম্রাটের অপ্রতিহত ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য 1614 থেকে ফ্রান্সের পার্লামেন্ট বা স্টেটস্ জেনারেল ডাকা বন্ধ হয়ে যায়। নিয়মানুসারে ফরাসি দেশে স্টেটস্ জেনারেলের অধিবেশন ডাকার অধিকার ছিল একমাত্র রাজার। ফ্রান্সের বুরবোঁ বংশীয় রাজারা সেই সুযোগ নিয়েছিলেন। ফলে স্বৈরতন্ত্রের যে বীজ পোঁতা হয়, তা পঞ্চদশ ও ষোড়শ লুইয়ের সময় আরও বেড়ে যায়। প্রতিনিধি সভা না থাকায় জনকল্যাণের কোনও প্রচেষ্টা হয়নি, জনগণের ইচ্ছা কখনও শাসনকার্যে প্রতিভাত হয়নি।

প্রসঙ্গত বলা দরকার যে, ইয়োরোপে অষ্টাদশ শতকে জ্ঞানদীপ্তির প্রভাবে প্রাশিয়ার দ্বিতীয় ফ্রেডারিক, অস্ট্রিয়ার দ্বিতীয় যোসেফ এবং রাশিয়ার দ্বিতীয় ক্যাথারিন প্রমুখ রাজা-রাণী প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচার (Enlightened Despotism) নীতি গ্রহণ করলেও ফ্রান্সে প্রজাহিতৈষণার কোনও ব্যাপার ছিল না। ইতিহাসবিদ স্কেভিল তাই লিখেছেন, "স্টেটস্ জেনারেলের অধিবেশন বন্ধ থাকার ফলে সাধারণ লোকের অসুবিধা ও অভিযোগের কথা সম্রাটের কাছে পৌঁছোনো সম্ভব ছিল না এবং সম্রাটের পক্ষেও সাধারণ প্রজাদের অবস্থার কথা বোঝা সম্ভব ছিল না। ফলতঃ বুরবোঁ রাজবংশের শাসনতন্ত্র ছিল বৃহত্তর জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন।"

ডেভিড টমসন ঠিকই লিখেছেন যে, "ফরাসি রাজতন্ত্র ছিল সামন্ততান্ত্রিক রাজতন্ত্র যা শতাব্দী-প্রাচীন রাজা, অভিজাত, যাজক এবং তৃতীয় এস্টেটের মধ্যে সামন্ততান্ত্রিক সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল ছিল। টমসন আরও লিখেছেন, "This theoretically absolute monarchy was in practice powerless to effect the changes that most urgently needed making"। তাছাড়া বুরবোঁ রাজতন্ত্র আইনত সর্বশক্তিমান ছিল ঠিকই কিন্তু বাস্তবে সম্রাট অভিজাত ও যাজক শ্রেণীর উপর নির্ভর করতেন। অভিজাত শ্রেণী সরকারি ক্ষমতা কিছুটা হস্তগত করেছিল। বিশেষ অধিকার বা 'প্রিভিলেজ' রক্ষা করার ব্যাপারে তারা ছিলেন বিশেষ তৎপর। ইতিহাসবিদ নর্মান হ্যামসন তাই লিখেছেন যে, "শাসন ব্যবস্থায় অভিজাত শ্রেণীর অনুপ্রবেশের ফলে অবাঞ্ছিত ফলাফলের সৃষ্টি করে।" বিখ্যাত ইতিহাসবিদ জর্জ লেফেভর মন্তব্য করেছেন যে, "ফরাসি রাজতন্ত্র ছিল ইংল্যান্ডের সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও ইয়োরোপীয় মহাদেশের স্বৈরতন্ত্রের মাঝামাঝি স্তর।” তদুপরি ফরাসি সম্রাটগণ অনেকেই ছিলেন বিলাসী, পরিশ্রম বিমুখ। পঞ্চদশ লুইয়ের চারিত্রিক দোষও ছিল। ষোড়শ লুই সৎ এবং সদিচ্ছাপরায়ন হলেও ব্যক্তিত্বহীন। তাঁর অযোগ্যতার কারণেই রাণী মারি আঁতোয়ানেত বিশেষ প্রভাবশালিনী হন।

বুরবো বংশীয় নরপতি ষোড়শ লুই ফ্রান্সের এক সঙ্কটময় মুহূর্তে ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন । প্রজার মঙ্গলের জন্য তাঁর সদিচ্ছা ছিল; কিন্তু সেই ইচ্ছাকে কাজে পরিণত করার মত মানসিক দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা তাঁর ছিল না । অন্যদিকে তিনি ছিলেন রাণী মারিয়া আতোঁয়ানেতের দ্বারা প্রভাবিত । আতোঁয়ানেত ছিলেন অস্ট্রিয়ার রাণী মারিয়া টেরেসার কন্যা। বিলাসিনী, অভিমানিনী এবং দাম্ভিক প্রকৃতির এই রাণী দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছিলেন দক্ষ; কিন্তু ফরাসি দেশ ও জাতি সম্পর্কে ছিলেন অনভিজ্ঞ। সুতরাং বিলাসে মত্ত রাণীর প্রভাব ও পরামর্শ শীঘ্রই সাম্রাজ্যের সঙ্কট ত্বরান্বিত করল।

ফ্রান্সের বিপ্লবের পিছনে ফরাসি রাজতন্ত্রের দায়িত্ব বলতে গিয়ে ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন রাজা দৈব-অধিকারে বিশ্বাসী, স্বৈরাতান্ত্রিক এবং অকর্মণ্য ছিলেন। ফরাসি রাজাদের আরও সীমাবদ্ধতা ছিল। ফ্রান্সের চার্চ ছিল স্বয়ং-শাসিত সংস্থা। তাই সম্রাট চার্চের আভ্যন্তরীণ শাসনে হস্তক্ষেপ করতে পারতেন না। চার্চের বিপুল ভূ-সম্পত্তির উপর করও ধার্য করতে পারতেন না। যাজকেরা গির্জার ভূমির উপর স্বেচ্ছা কর দিতন । দ্বিতীয়তঃ, ফ্রান্সের প্রদেশগুলিতে যে প্রতিনিধি সভা বা পার্লামেন্ট (ফরাসি উচ্চারণ পার্লম) ছিল সেগুলির নির্দেশ ছাড়া সম্রাটের কোনও নির্দেশ প্রদেশগুলিতে কার্যকর করা যেত না। পার্লামেন্ট ইচ্ছে করলে প্রস্তাবিত আইনকে নাকচ পর্যন্ত করতে পারত। আসলে পুরোনো সমাজে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার সহজ সাধ্য ছিল না। ক্রমশই আঠারো শতকে পার্লামেন্টগুলি অভিজাত শ্রেণীর হাতে রাজার স্বৈরাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। একদিকে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীর স্বার্থপরতা ও দূর্নীতি ও অন্যদিকে রাজাদের অক্ষমতা রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। এর ফলে তেমনি রাজারা দূর্নীতি দমনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফিশার তাই মন্তব্য করেছেন, "The Revolution came because the king failed to solve the question of privilege," অভিজাতদের বিশেষ সুবিধা বন্ধের ক্ষমতা রাজার ছিল না। মাদেলা (Madelin) তাই লিখেছেন যে, "ফরাসি রাজতন্ত্রই বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল।"

ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক কারণ বলতে হলে শুধুমাত্র রাজতন্ত্রের দায়িত্ব বললে চলবে না, ফরাসি রাষ্ট্রের স্বরূপও জানতে হবে। একথা ঠিকই যে, পুরোনো ব্যবস্থার রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল রাজতন্ত্র। একদিকে অভিজাত শ্রেণীকে দাবিয়ে নিরঙ্কুশ রাজকীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল অন্য দিকে রাজার ক্ষমতার উপর মধ্যযুগীয় প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা বর্তমান ছিল। যেমন সাংবিধানিক মর্যাদা ছিল গ্যালিকান চার্চ বা ফরাসি ক্যাথলিক চার্চের, তেমনি পার্লামেন্টের বা প্রাদেশিক প্রতিনিধি সভার।

পার্লামেন্ট (পার্লম) রাজার আইন নথিভুক্ত করত। কিন্তু আঠারো শতকে রাজতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান দুর্বলতার সুযোগে পার্লামেন্ট প্রতিবাদের (Remonstrances) অধিকার প্রয়োগ করত। পার্লামেন্টগুলির ছিল সর্বোচ্চ রাজকীয় বিচারালয়। এরকম বারোটি পার্লামেন্ট ছিল। তার মধ্যে প্যারিসের পার্লামেন্ট ছিল সব থেকে শক্তিশালী। পঞ্চদশ লুই পার্লামেন্ট ভেঙে দিলেও অভিজাতদের চাপে ষোড়শ লুই সেগুলিকে আবার উজ্জীবিত করেন। পার্লামেন্টের সদস্যপদ রাজার কাছ থেকে যেত, আবার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যেত। সুভাষরঞ্জন চক্রবর্তী লিখেছেন, "পার্লম নতুন সদস্য নিতে পারত। সদস্য নিয়োগে রাজার হস্তক্ষেপের অধিকার ছিল না। সুতরাং পার্লমর সদস্যেরা অনেকদিনই রাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল এবং রাজার দুর্বলতার সুযোগে পার্লম নিজের অধিকার রক্ষায় বিশেষ সচেষ্ট হয়। বিচারব্যবস্থার উৎস রাজা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা পরিষ্কার। বিচার ব্যবস্থা ছিল জটিল এবং বিশৃঙ্খল। বিশেষ সুবিধা থাকার ফলে বিচার বা আইনের শাসন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের আস্থার অভাব ছিল।"'

এখানে বলা দরকার, রাজা কোনও নতুন আইন জারি করলে তা পার্লামেন্টগুলিতে নথিভুক্ত করতে হত, নতুবা আইন বৈধ হত না। পার্লামেন্টগুলির বিচারকগণ ছিলেন অভিজাত শ্রেণীর। পার্লামেন্ট ইচ্ছা করলে রাজার প্রস্তাবিত আইনকে নাকচ করতে পারত। অভিজাতরা তাদের বিরুদ্ধে কোনও আইন রাজা করলেই তা নথিবদ্ধ করত না। এর ফলে আইনটি বৈধ হতনা। রাজা অবশ্যই Lit de Justice বা রাজকীয় অধিবেশনের আহ্বান করে এই প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করতে পারতেন। কিন্তু পার্লামেন্টের সভায় নিজে সভাপতিত্ব করে Lit de Justice প্রয়োগ করে অভিজাতদের চটাতে রাজা চাইতেন না। প্যারিসের পার্লামেন্ট -এর অভিজাত শ্রেণীর সদস্যরা ছিলেন খুবই শক্তিশালী। তারা মন্ত্রী তুর্গোর প্রস্তাবিত মৌলিক সংস্কারের ব্যবস্থা কার্যকর হতে দেয় নি। সুতরাং একথা বলা যায় যে, পার্লামেন্ট বা অভিজাত বিচার সভাগুলি শক্তিশালী ছিল।

প্রশাসনিক কাঠামোতেও পুরোনো ব্যবস্থার প্রভাব থাকাতে নতুন প্রয়োজন ভিত্তিক সংস্কার সহজ সাধ্য ছিল না। চতুর্দশ লুইয়ের আমল থেকেই শাসন ব্যবস্থা কেন্দ্রীভূত হয়, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনব্যবস্থা শিথিল হয়। "কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় কর্তা ছিল রাজা বা রাজপ্রতিনিধি। কেন্দ্রে শাসন চলত রাজপরিষদ বা দশজন মন্ত্রীর মাধ্যমে। দশজন মন্ত্রীর মধ্যে চ্যান্সেলর, রাষ্ট্রীয় সচিব ও আর্থিক নিয়ামক ছিল। মন্ত্রীরা নিজের নিজের বিভাগে থাকতেন। এঁদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব ছিল। ফলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিত। বাজেট তৈরী অর্থাৎ আয়-ব্যয়ের অগ্রিম হিসাব রচনার কোন ব্যবস্থা ছিল না। ষোড়শ লুই এর আমলে প্রচলিত ব্যবস্থার অবনতি প্রকট হয়েছিল। রাজার নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা স্পষ্টতই অনুপস্থিত ছিল।"

রাজতন্ত্রে অপদার্থতা ছাড়াও ভার্সাই রাজপ্রাসাদের বিলাসী জীবনযাত্রা ও রাজপরিবারের অমিতব্যয় ফরাসি জনগণকে রাজতন্ত্রের উপর বিরূপ করে তুলেছিল । রাজপ্রাসাদে দাসদাসী ও রাজকর্মচারী ছিল প্রায় দু'হাজার । আঁতোঁয়ানেতের সহচরীর সংখ্যাও ছিল প্রায় পাঁচশো । এছাড়া ছিল প্রায় দুশো ঘোড়া ও শকট । উৎসব হত প্রায়শই। সব মিলে বিপুল অর্থ ব্যয় হত।

আঠারো শতকে দূর্নীতিপূর্ণ শাসননীতির জন্য বুরবোঁ রাজতন্ত্রের কোনও মহিমা অবশিষ্ট ছিল না। সরকারি কর্মচারীগণ এবং বিচারকগণ ছিলেন দুর্নীতিপরায়ণ। বিচার ব্যবস্থা ছিল খুবই ত্রুটিপূর্ণ। লেতর দ্য গ্রাস (Lettre de grass) এবং লেতর দ্য ক্যাশে (Lettre de cachet) দ্বারা নাগরিকদের অধিকার খর্ব করা হয়। প্রথমটি দ্বারা ক্ষমতা প্রয়োগ করে রাজা আদালত দ্বারা প্রদত্ত শাস্তি মকুব করতে পারতেন। আর দ্বিতীয়টির দ্বারা বিনা বচারে যে কাউকে কারাগারে আটকে রাখতে পারতেন। লেতর দ্য ক্যাশে প্রয়োগ করে হাজার হাজার লোককে বিনাদোষে বিনা বচারে বাস্তিল দুর্গে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। সেইজন্য বিপ্লব শুরু হওয়ার মুহূর্তে জনতা ক্ষেপে গিয়ে বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ করে।

এছাড়া প্রদেশগুলিতেও দুর্নীতি ছিল। এ বিষয়ে বলা হয়েছে যে, "ফ্রান্সের প্রদেশগুলি দুভাগে বিভক্ত ছিল, প্রথমটিতে রাজার ক্ষমতা অবিসংবাদী ছিল না । এখানে প্রাদেশিক এস্টেট বা তার মনোনীত কর্মচারীর উপরে ইনটেনড্যান্ট (Intendant) দের পুরো কর্তৃত্ব ছিল না । অন্যত্র রাজপ্রতিনিধির ক্ষমতা নিরঙ্কুশ । অষ্টাদশ শতকের শেষে স্থানীয় শাসনের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীদের উপর দোর্দন্ডপ্রতাপ ছিল ইনটেনড্যান্টদের। বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে সাধারণ প্রশাসন, পুরসভা, বাণিজ্য, শিল্প, কৃষিব্যবস্থা এবং রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়ের ওপরে ইনটেনড্যান্টদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল।"। তাদের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় শক্তি বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে ছিল ঠিকই কিন্তু এই কর্মচারীগণ ছিল ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতন অর্থলোলুপ। জনগণের দুর্গতিরও শেষ ছিল না।

সুতরাং রাজতন্ত্রের ব্যর্থতাই বিপ্লবের পথ তৈরি করে। তবে ডেভিড টমসন লিখেছেন যে, রাজনৈতিক সঙ্কট বিপ্লবের সূচনা করলেও রাজনৈতিক সঙ্কট একমাত্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতেই ব্যাখ্যা করতে হবে।

তোমাকে অনেক ধন্যবাদ ফরাসি বিপ্লবের জন্য বুরাবোঁ রাজতন্ত্রের দায়িত্ব কতখানি? এই নোটটি পড়ার জন্য

About the author

Irisha Tania
"আমি সেই মেয়ে, যে শব্দে বাঁচে। কলম আমার অস্ত্র, আর কাগজ আমার স্বপ্নের আকাশ। প্রতিটি অনুভব, প্রতিটি চিন্তা আমি সাজিয়ে রাখি অক্ষরের গাঁথুনিতে। কখনো গল্পে, কখনো কবিতায়, আবার কখনো নিঃশব্দের ভেতরে। আমি লিখি, কারণ লেখার মাঝে আমি নিজেকে খুঁজে পাই। …

Post a Comment

🌟 Attention, Valued Community Members! 🌟