ঔরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতি মুঘল সাম্রাজ্য পতনের জন্য কতটা দায়ী ছিল তা আলোচনা কর
মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব ইসলামের প্রকৃত সেবক হিসাবে ইসলামীয় আদর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্র নীতি নির্ধারণের উদ্যোগ নেন ৷ কোরআনে বর্ণিত সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ধর্মীয় আইন অনুসারে রাষ্ট্রের আইনগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন ৷ তিনি ধর্মশ্রয়ী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তনের সুস্পষ্ট উদ্যোগ নেন ৷ মধ্যযুগের ভারত ইতিহাসের ঔরঙ্গজেব ব্যক্তিগত ধর্মনীতির দ্বারা তার রাষ্ট্র ব্যবস্থা কতটা প্রভাবিত হয়েছিল তা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের সূচনা করেছেন ৷ তিনি অ-মুসলমান বিশেষ করে হিন্দুদের বিরুদ্ধে যেসমস্ত অত্যাচারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, তা সম্রাটের ধর্মীয় গোঁড়ামি ছাড়া আর কিছু নয় । তিনি মুদ্রায় 'কালমা' ব্যবহার বন্ধ সূচনা করেন , কেননা মুদ্রা মুসলমান ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায় ব্যবহার করে। এর পর তিনি হিন্দুদের রাষ্ট্রের উচ্চপদে নিয়োগ বন্ধ করেন। জিজিয়া ও তীর্থকর পুনঃপ্রবর্তন করেন । সুতরাং সম্রাট ঔরঙ্গজেবের এই সমস্ত নীতি ধর্মান্ধতার পরিচয় এবং শেষ পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে সম্ভব করেছিল ।
খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে যে ঔরঙ্গজেব কি প্রকৃতই ধর্মান্ধ ছিলেন? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে গেলে কতকগুলি বিষয় আলোচনা করা দরকার । প্রথমত, একথা অনস্বীকার্য যে বিভিন্ন মুসলমান শাসকরা ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্র ব্যবস্থা তত্ত্বের দিক থেকে ভারতে গড়ে তোলেন । কিন্তু বাস্তবের দিক থেকে এর প্রয়োগ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন ছিল । সর্বদা এই একটা কথা মাথায় রাখা অত্যন্ত আবশ্যক যে কখনো কোন সাম্রাজ্যের পতনের পেছনে কোন কারণ এককভাবে দায়ী থাকে না । তেমনি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পেছনে শুধুমাত্র ঔরঙ্গজেবের ধর্মীয় নিতে এককভাবে দায়ী ছিল না।, এর পিছনে অন্যান্য কারণ ছিল যেমন তার ভুল সিদ্ধান্ত দাক্ষিণাত্য নীতি, জায়গিরদারী সংকট,বিশাল সাম্রাজ্যের পরিচালনা,যোগ্য রাজার অভাব প্রভৃতি ।
হিন্দুদের প্রতিও তাঁর নীতি ধর্মীয় গোঁড়ামি দ্বারা প্রভাবিত হয়। ১৬৬৯ সালে তিনি ব্যাপকভাবে হিন্দুমন্দির ধ্বংসের আদেশ দেন। তার মধ্যে মথুরা, বেনারস এবং সোমনাথের মন্দির উল্লেখযোগ্য। ১৬৭১ খৃষ্টাব্দে তিনি আদেশ জারী করেন যে খালিসা জমির সমস্ত রাজস্ব সংগ্রাহক হবেন মুসলমান। হিন্দু পেসকার এবং দেওয়ানদের বরখাস্ত করা হয়। রাজপুত ও মারাঠাদের উপর ঘোড়ায় আরোহণ, মূল্যবান পোষাক-পরিচ্ছদের ব্যবহার, অস্ত্র ব্যবহার ইত্যাদি নিষেধাজ্ঞা জারী করেন। এরপর ১৬৭৯ সালে 'জিজিয়া' প্রবর্তন তাঁর অ-মুসলমানদের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতার প্রমাণ।
সম্রাট ঔরঙ্গজেব রাজা জয়সিংহের সঙ্গে পত্রালাপ প্রমাণ করে যে তিনি রাজপুতদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে চেয়েছিলেন । আম্ম-ই-আলমগিরি থেকে জানা যায় যে সম্রাট মহম্মদ আমিন খাঁকে তিরস্কার করেন কারণ তিনি দু'জন হিন্দু বকসীর মধ্যে একজনকে সরিয়ে একজন মুসলমান বকসী নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু ঔরঙ্গজেব যশবন্ত সিংহের মৃত্যুর পর মেওয়ারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে ও তাদের মুসলিম করার বা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেন । এর ফলে মুঘলদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও বীর ‘রাজপুত’ মিত্ররা শত্রুতে পরিণত হয় । দীর্ঘস্থায়ী রাজপুত যুদ্ধের ফলে মুঘলদের প্রচুর অর্থ ও সামরিক ক্ষতি হয় ।
নবম শিখ গুরু তেগ বাহাদুর ইসলাম ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর অপরাধে ঔরঙ্গজেব তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন (১৬৭৫ খ্রি.)। এই ঘটনা শিখ সম্প্রদায়ের জনগনরা মুঘলদের চিরশত্রুতে পরিণত করে । এর প্রতিবাদে গুরু গোবিন্দ সিংহ মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য 'খালসা' নামে এক সামরিক বাহিনী গড়ে তোলেন । শিবাজীকে দমন করার চেষ্টা এবং পরবর্তীতে শিবাজীর পুত্র শম্ভুজীকে নৃশংসভাবে হত্যা করায় মারাঠারা মুঘলদের বিরুদ্ধে মরণপণে সংগ্রামে লিপ্ত হয় ।
ঔরঙ্গজেবের ধর্মীয় কট্টরতা শুধু হিন্দুদের বিরুদ্ধেই ছিল না, শিয়া মুসলিমদের প্রতিও তাঁর তীব্র বিদ্বেষ ছিল । এই কারণে তিনি দাক্ষিণাত্যের শিয়া রাজ্য বিজাপুর ও গোলকুন্ডা উপর অভিযান চালান । ইতিহাসবিদ স্যার যদুনাথ সরকারের মতে, "এই 'দাক্ষিণাত্য ক্ষত' বা দীর্ঘ ২৫ বছরের যুদ্ধ মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল ।"
স্যার যদুনাথ সরকারের মতে," ঔরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতিকেই মুঘল পতনের প্রধান কারণ হিসেবে গণ্য করা যায় ।" তবে আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, কেবল ধর্মীয় নীতিই নয়—জায়গিরদারি সংকট, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী দুর্বল উত্তরাধিকারীদের অযোগ্যতাও মুঘল সাম্রাজ্য পতনের জন্য এককভাবে দায়ী ছিল । সংক্ষেপে বলা যায়, ঔরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের একমাত্র কারণ না হলেও, তা সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বের মূল ভিত্তি অর্থাৎ "সব ধর্মের মানুষের সম্প্রীতি ও সমর্থন" চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছিল।
পরিশেষে বলা যায়, ঔরঙ্গজেবের কট্টর ধর্মীয় নীতি মুঘল সাম্রাজ্যের নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত দুর্বল করে দিয়েছিল । তাঁর অদূরদর্শী নীতির কারণে সাম্রাজ্য বহু যোগ্য অ-মুসলিম কর্মকর্তা, রাজপুত সৈন্য এবং সাধারণ প্রজাদের আনুগত্য হারায় । ফলে তাঁর মৃত্যুর মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করে ।
