রুমানিয়া সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা কর
রুমানিয়া নামে কোনও দেশ উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের আগে ইয়োরোপে ছিল না। রুমানিয়ার অধিবাসীরা মোলডাভিয়া ও ওয়ালেচিয়া নামে দুটি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। তুরস্কের সাম্রাজ্য থেকে গ্রিস বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন হয়ে গেলে সুলতান আব্দুল আজিজ এক সনদে অ-তুর্কি প্রজাদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও রুমানিয়ান প্রদেশ দুটিতে মৌলবাদী তুর্কিরা ঘোরতর অত্যাচার আরম্ভ করে। ফলে 1830 থেকেই মোলডাভিয়া ও ওয়ালেচিয়া প্রদেশের অধিবাসীরা সংযুক্ত হয়ে একটি জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের ইচ্ছা পোষণ করত। তাদের ভাষা ও ঐতিহ্য ছিল এক, নিজেরা পরিচয় দিত রুমানিয়ান বলে। এটিই হলো রুমানিয়া সমস্যা। রুমানিয়ান জাতির একাংশ অস্ট্রিয়াতেও বসবাস করত। তারাও নিজেদের জন্য নতুন দেশ চাইত। 1850 খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় নেপোলিয়ান যখন জেরুজালেমের উপর তার পুরাতন অধিকার দাবি করেন তখন তুরস্কের সুলতান ফ্রান্সের অধিকার মেনে নেন। আবার রাশিয়া সুলতানের উপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তুরস্কের অন্তর্ভুক্ত মোলডাভিয়া (Moldavia) ও ওয়ালেচিয়া (Wallachia) প্রদেশ দুটি অধিকার করে। এই ঘটনা থেকে।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধ (1854-56) সংঘটিত হলো। যুদ্ধের পর প্যারিসের সন্ধি (1856) অনুসারে রাশিয়া মোলডাভিয়া ও ওয়ালেচিয়া অঞ্চল দুটি তুরস্ককে ফেরৎ দিতে বাধ্য হয়। তবে তুরস্কের অধীনে থেকেও রাজ্য দুটি স্বায়ত্তশাসনের অধিকার লাভ করে। এই সময় তুরস্কের সুলতান তাঁর সাম্রাজ্যে প্রজাকল্যাণকর শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনে অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন। বাস্তবত, তিনি তা পালন করেননি। ফলে বলকান জাতিগুলির মধ্যে তুর্কিবিরোধী মনোভাব জেগে উঠল।
দানিয়ুব নদীর উভয় তীরে অবস্থিত মোলডাভিয়া ও ওয়ালেচিয়া প্রদেশ দুটির জনগণ ধর্মে ও রক্তে, কৃষ্টি ও সভ্যতায় এক ও অভিন্ন ছিল। 1848 খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের প্রভাবে রুমানিয় জাতীয়তাবাদ জেগে ওঠে। তখন ওয়ালেচিয়ার বুখারেস্ট শহরে এক অস্থায়ী জাতীয় সরকারও গঠিত হয়। এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন রুমানিয় ঐতিহাসিক নিকোলাস বেলসেস্কো। কিন্তু পরে রুশ ও তুর্কিসেনা যৌথভাবে মোলডাভিয়া ও ওয়ালেচিয়া দখল করে নেয়। তবে ছাত্র আন্দোলনের ফলে রুশ সেনা সরে যায়। তারপর ক্রিমিয়ার যুদ্ধ এবং শেষে প্যারিসের সন্ধিতে প্রদেশ দুটি স্বায়ত্তশাসন পায়। ঐ সন্ধির শর্তানুসারে রুমানিয় ভাষাভাষী বেসারাবিয়া প্রদেশও রাশিয়া ফিরিয়ে দিলে তা মোলডাভিয়া-ওয়ালেচিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। এবার সুলতানের অবহেলার জন্য তারা তুর্কি-বিরোধী আন্দোলন শুরু করল। জাতীয় প্রতিনিধিরা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, তারা দুটি প্রদেশকে একত্র ক'রে একটি অখণ্ড স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করবে। ইয়োরোপীয় রাষ্ট্রবর্গের মধ্যে ফ্রান্স ও রাশিয়া এই দাবি সমর্থন করলেও অস্ট্রিয়া ও ইংল্যান্ড এর বিরোধিতা করল। তখন নেতৃবৃন্দ কর্নেল আলেকজান্ডার কুজা (Col. Alexander Couza) নামক এক সেনানায়ককে একত্রীভূত রাষ্ট্রের (মোলডাভিয়া ও ওয়ালেচিয়া) নরপতি রূপে মনোনীত করলেন (1859)। এরপর শুরু হলো ইয়োরোপীয় রাষ্ট্রবর্গের শলাপরামর্শ। অবশেষে 1861 খ্রিস্টাব্দে ইয়োরোপীয় রাষ্ট্রবর্গ উক্ত দুটি প্রেেদশের মিলনকে স্বীকৃতি জানাল। পরের বছর 1862 খ্রিঃ স্বাধীন প্রদেশ দুটির মিলিত নাম হলো রুমানিয়া। এর রাজধানী হলো বুখারেস্ট। ইংল্যাণ্ড, অস্ট্রিয়া এবং তুরস্ক মোলডাভিয়া ও ওয়ালেচিয়ার সংযুক্তিকরণে আপত্তি করেছিল কারণ তা প্যারিস সন্ধির পরিপন্থী ছিল। অপরপক্ষে ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ান রুমানিয় জনগণের জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারও আপত্তি করেন নি। ফলে স্বাধীন রুমানিয়া রাষ্ট্রের সৃষ্টি হলো। আলেকজান্ডার কুজা (1859-66) ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদ, মঠ উচ্ছেদ, আধুনিক শিক্ষাবিস্তার ইত্যাদির মাধ্যমে রুমানিয়াকে শক্তিশালী করেন এবং পরবর্তী শাসক ক্যারল (1866-1914)-এর আমলে রুমানিয়ার আরও সমৃদ্ধি
ঘটে।
